Saturday, May 30, 2015

মাইক্রোক্রেডিটের বন্যা, অত:পর সুনামি (!?)

মাইক্রোক্রেডিট নিয়ে সমালোচনা নতুন নয়। কিন্তু সমালোচনা বেশীরভাগই ভাবাবেগ ও পক্ষ নিভর নির্ভর । অনেক বিশেষজ্ঞই অনেকভাবে অনেক মাত্রায় এর সমালোচনা করেছেন। তবে বেশীরভাগ আলোচনাতেই মাইক্রোক্রেডিট, গ্রামীন ব্যাংক এবং ড. ইউনুস এর সীমানা ও দায় অনির্ধারিত বা অস্পষ্ট। সাধারণ্যে এর সবচেয়ে বড় দোষ উচ্চ সুদের হার। কিন্তু মাইক্রোক্রেডিট নিয়ে কোন সমালোচনাতেই বলা হয়না এটা নিষিদ্ধ করা হোক। আসলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সমালোচনার নামে যা হয়েছে তা হচ্ছে গীবত; কারন সমালোচনা হলে এই খাতের দূর্বলতা কাটিয়ে দিনে দিনে তার উন্নতি হত। কিন্তু প্রায় চার দশক ধরে এর আগমন হলেও এর কাঠামোগত, পদ্ধতিগত বা ব্যবহারিক উৎকর্ষ সাধিত হয়নি, সেবা প্রদানের ব্যয় কমানোর কোন উদ্যোগ দেখা যায়না বরঞ্চ দিনে দিনে তা টাকা তৈরীর সহজ ও সস্তা কিন্তু ভীষন লাভজনক যন্ত্র হিসাবে বিকষিত হয়েছে। বাঙ্গালীমধা একে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়! হাটে-মাঠে-ঘাটে-সারাতল্লাটে চালু হয়েছে নানা নামে ঢঙ্গে এনজিও নামক ব্যাঙ এর ছাতার নীচে মাইক্রোক্রেডিট সেবা!!
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই খাত এখন সবচেয়ে বেশী অনিয়ণিত্রত মহীরূহ। হাজার হাজার মানুষের কোটি কোটি টাকা সংশ্লিষ্ট এই খাতে । বাংলাদেশে এই মহূীর্তে ঠিক কতগুলি মাইক্রোক্রেডিট দাতা প্রতিষ্ঠান আছে এর হিসাব সয়ং বিধাতা ছাড়া আর কারো পক্ষে জানা সম্ভব নয়। সুতরাং সেবা গ্রহীতাদের প্রকৃত সংখ্যা জানতে চাওয়াই অপরাধ! তারপর আবার আছে Overlapping। তবে এটা ধরে নেওয়া যায় নিদেন পক্ষে কোটি দুয়েক মাইক্রোক্রেডিট গ্রহীতা বাংলাদেশে আছে। তবে এই খাতে কত টাকা বিনিয়োগ করা আছে, বিনিয়োগকৃত টাকার কত অংশ উদ্যোক্তাদের (এনজিও মালিকদের ?!!) আর কত অংশ ঐ “Poorest of the poor” দের সঞ্চিত তাও অস্পষ্ট। এই প্রেক্ষিতে সহীহ্ তথ্যের তালাস করা কয়লার খনিতে কালো বেড়াল খোজার মতোই! এই সেক্টরে যদি কোন কারনে বর্তমান স্বনিয়ন্ত্রিত ও প্রচলিত (বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই আসলে অনিয়ন্ত্রিত) ব্যবস্থা ভেংগে পড়ে তাহলে আমাদের সমাজ ও অর্থনীতিতে যে সুনামী বয়ে যাবে তা নিয়ন্ত্রন বা মোকাবেলার সামর্থ সরকারের নাই। কারন আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজের অসংখ্য মানুষের বহু কষ্টের সঞ্চিত লক্ষ কোটি টাকা জড়িয়ে গেছে “মাসে লাখের উপর” লাভের লোভের ও ফাঁদে পরে। এছাড়াও রয়েছে বাধ্যতামুলক সষ্ণয় নামে ঋণগ্রহিতাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের বিশাল পাহাড়। কোন ঝামেলা হলে পালাবে মালিক, তার লাভ সে আগেই তুলে নিয়েছে। আখেরে লোকসান সেই আমজনতার। আর দেশবাসীর জন্য এটা হবে মহাসুনামী। কারণ দিনের শেষে সবকিছুর মূল্য পরিশোধ করতে হয় এই দেশের আপামর জনতার। তবে সব বিশৃংখলাতেই সূবিধাভোগী সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে ব্যাতিক্রম হবেনা।
যে কোন ক্রেডিট কেবলমাত্র তখনই দরকারী ও উপকারী যখন তা উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়, না হলে তা হবে আত্নবিনাসী, ব্যক্তি ও সমষ্টি উভয়ের জন্যই। বাংলাদেশের মাইক্রোক্রেডিট খাতের কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও সচেতন অবহেলার কারণে এই আত্নঘাতি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সচেতনভাবে প্রায় সকল ক্রেডটদাতারাই ক্রেডিটের কাযকর ব্যবহারের দিকটি উপেক্ষা করে কেবলমাত্র কিস্তি আদায়ের দিকে মনযোগী, অথচ প্রায় সকল সংস্থারই কাগজে-কলমে ক্রেডিটের কাযকর ব্যবহার ক্রেডিট প্রদানের অন্যতম প্রধান শত । বাংলাদেশের মাইক্রোক্রেডিট খাতে কাগজে কলমে যে পরিমান নিয়োগ আছে বাস্তবে তার বিপরীতে সম্পদ অনেক কম সৃষ্টি হয়েছে। বরঙ মাইক্রোক্রেডিট সামাজিক ও মানব সম্পদের উপড় ফাইনান্স ক্যাপিটালের আধিপত্য নিরঙ্কুশ করণে সহায়কের ভূমিকা পালন করেছে। গৃহীত ঋণের অধিকাংশই অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যায় হয়ে এই খাতকে অন্ত:স্বার শূন্য করে ফেলেছে। তাই ব্যবস্থা ভেংগে পড়তে বাধ্য, দু’ দিন আগে বা পরে, কেবল সময়ের ব্যাপার।
এই পরিস্থিতিতে আমার কিছু সরল পর্যবেক্ষণ:
  • মাইক্রোক্রেডিট হিসাবে গৃহীত অর্থের বেশীরভাগই উৎপাদনের বদলে ভোগে ব্যয় হয়েছে।
  • অসংখ্য ঋণ গ্রহীতা পরিবারের বেশীরভাগ প্রাপ্ত বয়স্ক সদস্যদের নামেই নানা প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়া আছে।
  • বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই নতুন ঋণ গ্রহণের কারণ পুরাতন ঋণের কিস্তি পরিশোধ। ফলে প্রায় সবাই বিস্তারমান ঋণের জালে আবদ্ধ।
  • এক পর্যায়ে কিস্তি পরিশোধের জন্য ধার-দেনা বাড়ির মূল্যবান দ্রব্য সামগ্রী বিক্রি/বন্ধক এবং অতিরিক্ত পরিশ্রম করে অতিরিক্ত আয়ের জন্য সবার গলদ ঘর্ম যার ফলাফল কিঞ্চিত অতিরিক্ত দেশজ উৎপাদন ( আহারে সাধের জিডিপি বৃদ্ধি!), পরিনত হয়েছে বন্ডেড লেবারে।
  • এরপর যখন আর কোন উপায় থাকে না তখন পুরুষরা কিস্তিওয়ালাদের ( নব্য কাবুলিওয়লা নাকি ?!) হাত থেকে বাচার জন্য শহরে পলায়ন জীবন ধারণের জন্য ‘অন্য’ কাজের খোঁজে । ফলে শহরে ভাসমান লোক জনের সংখ্যা দ্রুতলয়ে ক্রমবর্ধমান।
  • যে হারে ঋণ বেড়েছে সেই হারে সম্পদ বাড়েনি, বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই ঋণ গ্রহণের ফলে সাময়িক ভোগ বাড়লেও নীট সম্পদ হ্রাস পেয়েছে,কিন্তু জীবন যাত্রার ব্যয় অভ্যাস বৃদ্ধি পেয়েছে।
  • আর বেশির ভাগ ঋণ গ্রহীতা হত দরিদ্র নারী হওয়ায় সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সামাজিক বিপর্যয় অত্যাসন্ন তা হল গ্রামে/ মফশ্বল শহরে এখন মৌসুমি/ভাসমান পতিতার সংখ্যা ক্রম বর্ধমান যার অন্যতম কারণ এই “কিস্তি”।
এই “Poorest of the poor” দের ভিতর যে নিরব হাহাকার চলছে তা বেশীরভাগ মানুষই শুনতে পায়না কিংবা সচেতনভাবে শুনেনা, বিশেষ করে যাদের শোনা দরকার। কারণ এদের আবার অনেকেরই রুটি-রুজি নির্ভর করে এই “Poorest of the poor” দের নিয়ে “Poverty trade” করে। অথচ “কিস্তি” এর আতঙ্কে অনেকের পারিবারিক কাঠমো ভেংগে পড়ার উপক্রম, বেড়ে যাচ্ছে পারিবারিক অস্থিরতা। আর পরিবারের অস্থিরতা সমাজে সংক্রামিত হয় গাণিতিক হারে কিন্তু সমাজের অস্থিরতা রাষ্ট্রে সংক্রামিত হয় জ্যামিতিক হারে। সম্প্রতি আমেরিকার হাউজিং বুদবুদ এবং এর ধারাবাহিকতায় বিশ্ব জুড়ে তুলকালাম কান্ড হয়ে গেল যার রেশ এখনো কাটেনি। আমেরিকার মধ্যবিত্ত সমাজকে ঋণের জাল থেকে বেড় করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য বিলিয়ন ডলারের “Bail Out” প্রকল্প চলছে। ফাইনান্স ক্যাপিটালের যুগে ডলারের কল্যাণে আমেরিকার কাছে “Money absolutely doesn’t matter”. কিন্তু আমাদের দেশের হতভাগা এই লক্ষ জনগোষ্ঠীর “Bail Out program” নিয়ে কে এগিয়ে আসবে!?
পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী আমার আশঙ্কা বাংলাদেশের মাইক্রোক্রেডিট খাতের শৃঙ্খলা অচিরেই একেবারেই ভেংগে পরবে। যদিও মাইক্রোফাইনান্স সেবা দাতারা (নাকি ব্যবসায়ীরা) অনেকেই দিন ধরেই নানা সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে তাদের লোকসান ঠেকানোর জন্য বা নিজের আখের গোছানো বা মুনাফা নিশ্চিত করার জন্য। ফলে ক্ষতি যা হবার তা ঐ “Poorest of the poor” দেরই একাংশের হবে। কারণ বর্তমানে বেশীরভাগ মাইক্রোফাইনান্স প্রতিষ্ঠানের আমানত (স্বেচ্ছা ও বাধ্যতামুলক) এবং ঋণ এর অনুপাত প্রায় সমান বা অনেক ক্ষেত্রেই আমানত বেশী।
অতীত অভীজ্ঞতায় দেখা যায় যে, আমাদের দেশে কোন সমস্যা মহামারী’র আকার না ধারণ করা পর্যন্ত কর্তাদের টনক নড়ে না। কিন্তু মাইক্রোক্রেডিট খাতের এই আসন্ন বিপর্যয় ঠেকাতে যত দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া যায় ততই মঙ্গল। কারণ এই মাইক্রোক্রেডিট গ্রহীতা গোষ্ঠী আমাদের জন-পিরামিডের একেবারে নিচে অবস্থিত। এই শ্রেনী ভেংগে পড়লে উপরের কোন শ্রেনীই এর বৈরী প্রভাবের বাইরে থাকতে পারবে না। এই রূঢ় পরিস্থিতি এড়াতে হলে এখনই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কিছু সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
ঋণের ট্র্যাপে আটকে পড়া এই হাজারো মানুষের Bail Out Program এর জন্য বাজেটের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী খাতে অন্তত অত্যধিক ঋণগ্রস্ত যারা নিয়ন্ত্রন বহির্ভূত কারণে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ফেরারী জীবন যাপন করছে তাদের Bail Out” এর জন্য নিদেন পক্ষে কিছু সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ দরকার। “Poorest of the poor” দের নিয়ে আর “Poverty trade” নয়্, এবার দরকার “Bail Out Program for the Poorest of the poor”. এজন্য জাতীয় ঐক্যমত সৃষ্টির জন্য একটি গণ প্লাটফরম দরকার যেখানে এ বিষয়ে যাবতীয় নীতি, পরিকল্পনা ো কর্মসূচী নির্ধারিত হবে। নইলে এখন যেমন ঋণের দায়ে আত্মহত্যার ঘটনা বিরল নয় তেমনি নিরন্ন মানুষদের দ্রোহের আগুনে সবকিছু ছাড়খার হয়ে যাবার উদাহরণ বিরল নয়, যার উত্তাপে ঝলসে যেতে পারে গোটা দেশ-জাতি।
প্রচলিত মাইক্রোক্রেডিট ব্যবস্থার ইতিবাচক দিকসমূহ
  1. Loan repayment habit
  2. Peer feelings and social integration
  3. Participation and cooperation
  4. Neighborhood and problem sharing
  5. Risk taking ability
  6. Increased productivity of human capital
  7. Entrepreneurial quality
  8. Experience of expending money
  9. Consumerism
সম্প্রতি এই সমালোচনায় নতুন মাত্রা এসছে সরকারের প্রধানমন্ত্রী-অর্থমণ্ত্রীসহ একাধিক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী প্রকাশ্য সমালোচনায়। কিছু ভূইফোর মিডিয়া এবঙ বাজারে অচল বুদ্ধিজীবির কল্যাণে সরকার ো মাইক্রোক্রেডিট এখন মূখোমূখী চাপা সাঙঘর্ষিক অবস্থায়। তাই স্বাভাবিকভাবেই সরকার এখন শত কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করে হাজারো নিয়ম কানুনুনের পরীক্ষা চালাবে এই খাতকে বসে আনার জন্য (ফলে পরজীবি বুদ্ধিজীবি বা তথাকথিত সুশীল সমাজের তাবেদারদের কিছুটা হলেো রুটি-রুজির ব্যবস্থা হবে!)। বাংলাদেশ ব্যাঙক ো বসে থাকবেনা নিয়ম জারির প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে। এমআরসি’র মতো আরো অনেক কিছুই সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু এই অবস্থানটি কোন পক্ষের জন্যই মংগলজনক নয়। কারণ নিয়ম প্রচলনের চেয়ে এর কার্যকারীতা নিশ্চিতকরণ বেশী গুরুত্বপূর্ন।

You may like:

বাংলাদেশের অর্থনীতির নায়ক!

বাংলাদেশের অর্থনীতির নায়ক যে দরিদ্র কৃষক কুল তাদের পুঁজির দরকার আছে কিন্তু যত দরিদ্র তাদেরকে ভাবা হয় আসলে তারা তত দরিদ্র নয়। বাংলাদেশের কৃষকেরা প্রত্যেক বছর ৩ কোটি টন এর অধিক ফসল দেশকে দেয় প্রায় কোন রকম সহযোগিতা বা প্রতিদান ছাড়াই। এই বিশাল উৎপাদন ব্যবস্থায় যে মহা বিশাল পুঁজি জড়িত তার অতি ক্ষুদ্র অংশই প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে সরবরাহ কৃত, প্রায় পুরটাই কৃষকের প্রচেষ্টায় সংগৃহীত আর মোট পুঁজির তুলনায় প্রদত্ত ভূর্তুকীতো নস্যি মাত্র। বর্তমানে দেশের যে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ কাঠামো তা থেকে প্রকৃত কৃষকেরা প্রায় কোন সুবিধাই পায়না, যা পায় তাও সময়মত পায়না। কৃষি উৎপাদনে জড়িত কৃষকের আর্থিক প্রয়োজন কেবল চাষাবাদের মৌসুমেই নয়, বরং সারা বছরই তার বিভিন্ন পরিমাণে আর্থিক প্রয়োজন দেখা দেয়। বাস্তবতার আলোকে প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে কৃষি উৎপাদনের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ কাঠামো দরকার যা সত্যি কার অর্থেই কৃষকের জন্য উপকারী এবং লাভ জনক হবে, যা হতে পারে বাণিজ্যিক চলতিমুলধন/নগদ ঋণের আদলে গৃহস্থালী ঋণ বা অন্য কিছু।
বর্তমান ব্যবস্থায় কৃষকের আবেদনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার আলোকে ব্যাংক সমূহ তার চাষাধীন জমির পরিমাণ ও ফসলের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ঋণ মঞ্জুর ও বিতরণ করে থাকে। শস্য ঋণ সাধারণত এক কিস্তিতে ফসল চাষের সময় বিতরণ ও উঠানর সময় আদায় করা হয়। এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট ফসল বপন কালে ঐ ফসলের সমুদয় উৎপাদন খরচ এককালীন ঋণ হিসাবে প্রদান করা হয়। এবং ফসল উঠানর প্রায় সাথে সাথেই ঋণের টাকা সুদ সহ আদায় করা হয়। ঋণ উত্তোলনের পর একেবারেই সব অর্থ ব্যয় হয়না, কিন্তু ঋণের সুদ গুণতে হয় ষোল আনা সারা বছর। আবার বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে ঋণের অর্থ অন্য খাতে ব্যয় হয়ে যায়। ফলে সেচ, সার-কীট নাশক ইত্যাদি কাজে ব্যয় করার জন্য হাতে সময় মত অর্থ থাকে না এবং উৎপাদন ব্যাহত হয়। অধিকাংশ সময় কৃষকেরা ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া সত্ত্বেও ফসল ওঠার আগ মুহূর্তে চড়া সুদে মহাজনদের কাছ থেকে ধার নিতে বাধ্য হয়। আবার বপনের সময় বেশী দামে বীজ কিনে ফসল উঠানর সাথে সাথে তুলনামূলক কম দামে ফসল বিক্রয় করতে হয় ঋণ পরিশোধের জন্য। ফসল ওঠা মাত্রই মহাজনরা তাদের পাওনা টাকা নিয়ে যায়, ব্যাংকের টাকা অনাদায়ী পড়ে থাকে। আংশিক টাকা ব্যাংকে জমা দিলে আবার তা ওঠান যাবেনা ফলে পরবর্তী ফসলের সময় আরও বড় সমস্যা হবে ভেবে অনেকেই হাতে কিছু টাকা থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকের টাকা আংশিক পরিশোধ করে না। কালক্রমে তা শ্রেনী কৃত তথা কু ঋণে পরিণত হয়। এক সময় সুদে আসলে ঋণের টাকা পরিশোধ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে কৃষকেরা নিজেরাও অর্থনৈতিক ভাবে পঙ্গু হয়ে যায়। প্রকৃত পক্ষে একজন কৃষককে প্রচলিত নিয়মে নিয়মিত ঋণ নেওয়া-দেয়া করতে হলে তার উৎপাদিত ফসল বেচতে হবে সংশ্লিষ্ট ফসলের জীবন চক্রে সর্ব নিম্ন দামের সময়, আর প্রয়োজনীয় ফসল বা বীজ কিনতে হবে সর্বোচ্চ দামের সময়।
বাংলাদেশের সাধারণ কৃষকদের জীবন ধারণ সময়ের সাথে সাথে চ্যালেনজিং হয়ে উঠেছে। সরল উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যে কৃষক নিপুণ শিল্পী তার অর্থনৈতিক জীবনেও এসেছে বহুমাত্রিকতা। বেশীর ভাগ কৃষক পরিবারের জীবন ধারণের জন্য যথেষ্ট ভূমি নাই। সে জন্য তাকে হতে হয় অতি হিসাবী। যেমন; ফসল উৎপাদনের বীজ সে যথাসম্ভব নিজের উৎপাদিত ফসল থেকে সংগ্রহ করে, যদি একান্তই সম্ভব না হয় তবে ঐ নির্দিষ্ট ফসল উৎপাদনের সময়ই প্রয়োজনের চেয়ে সাধ্যমত বেশী কিনে রাখার চেষ্টা করে, কারণ এ সময় উক্ত ফসলের দাম তুলনামূলক কম থাকে এবং বপনের সময় দাম বেশী থাকে। বপনের সময় অতিরিক্ত বীজ বিক্রি করে অন্যান্য ব্যয় নির্বাহ করে থাকে। আবার সুযোগ পেলে বাজারে যখন যে ফসলের দাম কম থাকে তা কিছুটা কিনে রেখে দাম বাড়লে বিক্রয় করে। অর্জিত মুনাফা তার জীবনকে সহজ করে। এভাবে খুব সাবধানে এবং ধীর গতিতে প্রায় কৃষকই শস্য কেনা-বেচার ব্যবসায় নিয়োজিত। অনেক অঞ্চলে যেটা ‘বান্দাই’ হিসেবে পরিচিত। এছাড়াও বছরের বিভিন্ন সময় সাময়িক ভাবে বিভিন্ন আয় উৎসারী কর্মকান্ডে নিয়োজিত থাকে। প্রায় সকল কৃষকই বহুমাত্রিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে তাদের জীবনের চাকা সচল রাখে, এখন আর কেউ কেবলমাত্র কৃষক বা কৃষি শ্রমিক নয়। শস্য ঋণের টাকা আনুষ্ঠানিক ঢঙ্গে বিতরণ না করে যদি একজন কৃষকের বাৎসরিক চাহিদা এবং তার ঋণ প্রাপ্তির যোগ্যতার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ঋণ সীমা নির্ধারণ করে চলতি/নগদ মূলধন ঋণের ন্যায় ঋণ হিসাব সৃষ্টি করা হয় যেখানে ঋণ গ্রহীতারা নির্দিষ্ট সময় অন্তর সুদ পরিশোধ সাপেক্ষে প্রয়োজন মত লেন-দেন করতে পারবে তাহলে ঋণের টাকার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার নিশ্চিত হবে যার ফলে সার্বিক উৎপাদনশীলতাও বৃদ্ধি পাবে এবং ঋণ ব্যবহার জনিত ব্যয় হ্রাস পাবে কিন' ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে।
এটা ঠিক যে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণ নয়, আভ্যন-রীন ভাবে প্রয়োজনের চেয়ে কিছু কম খাদ্য শস্য উৎপাদিত হয়। তবে এ ঘাটতি পুষিয়ে দেয় ঐ দরিদ্র কৃষকেরাই বছরের খানিক টা সময় (মঙ্গা,বন্যা,খরা ইত্যাদি দুর্যোগ কালে) এক বেলা/দু বেলা না খেয়ে বা কম খেয়ে। আমার বিশ্বাস পরিকল্পিতও সমন্বিত উৎপাদন ব্যবস্থায় বাংলাদেশের শস্য উৎপাদন বর্তমানের চেয়ে শতকরা ২০-৫০ ভাগ বৃদ্ধি করা সম্ভব অনায়াসেই। এখনো প্রতি বছর বিপুল পরিমাণে শস্য উৎপাদন যোগ্য সরকারী-বেসরকারি জমি অনাবাদী পড়ে থাকে। আবার যেগুলিতে চাষ করা হয় তার ফসল নির্বাচনও খুব একটা যৌক্তিক ও লাভ জনক নয় যথোপযোগী তথ্য, প্রযুক্তি ও উপকরণের অভাবে। সরকারের এক ঘোষণায় এক বছরের মধ্যে দেশের চাহিদা মিটিয়েও আভ্যন-রিন মোট উৎপাদিত খাদ্য শস্যের শতকরা প্রায় তিরিশ ভাগ বিশ্ব বাজারে রপ্তানির জন্য খাদ্য আমদানি কারক বিভিন্ন দেশে রোড শো এবং নৈশ ভোজের আয়োজন করার সুযোগ এনে দিতে পারে কর্তাদের। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক গুলিকে শস্য ঋণ প্রদানে নীতি সহায়তা করার জন্য বাংলাদেশে আবাদ যোগ্য প্রায় সকল ফসলের একর প্রতি উৎপাদন খরচ এবং ফসল ভিত্তিক জমির মৌসুমি ভাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারণ করাই থাকে, সেটাকে আরও বিজ্ঞান সম্মত করা যেতে পারে, সেই সাথে দরকার ছোট-খাট কিছু আইনি পরিবর্তন ও সমন্বয়। যেমন, কেউ তার নিজের জমি তিন মাসের বেশী ফেলে রাখতে পারবে না, রাখলে ঐ জমিতে স্বল্পতম সময়ে উৎপাদিত ফসলের জন্য মৌসুমি ভাড়ার সম পরিমাণ জরিমানা দিতে হবে। তবে সে নিজে অন্য কাউকে ভাড়া দিতে অক্ষম হলে কৃষি কর্মীকে জানালেই তার দায়িত্ব শেষ। চাষীরা হয় নিজেরাই অথবা কৃষি কর্মীর মাধ্যমে (সমবায় পদ্ধতি বা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তত্ত্বাবধানে) সহজেই জমি চাষের জন্য ভাড়া নিতে পারবে, একই জমিতে একাধিক চাষি আগ্রহী হলে নিজেদের মধ্যে লটারি করে নেবে। এছাড়া আবাদ যোগ্য সরকারী জমি একই ভাবে ফসল ভিত্তিক ভাড়া নেয়ার ব্যবস্থা থাকবে, অধিগ্রহণ কৃত জমিতেও কাজ শুরুর আগে স্বল্পকালনি সবজি চাষ করা যেতে পারে। সরকারী লোকদের পরিবার সহ প্রায় অর্ধ কোটি সদস্যরা শুধু খায়, বেশী খায়, কখনো কম খায় না, কিন্তু খাদ্য শস্য উৎপাদনে যে মহান কৃষকের অবদান, খাবার কম পড়লে তারাই নিজেরা কম খেয়ে, কখনো না খেয়ে এই ঘাটতির সমন্বয় করে। তাই তারা এই মহা নায়কদের বিভিন্ন স্বাস্থকর ফল খাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে, তারা তাদের অফিস-আদালত, সরকারী আবাসন সহ যত অব্যবহৃত খালি জায়গা আছে সেগুলির কোন স্থায়ী বড় কোন ভৌত পরিবর্তন না করে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী বিভিন্ন ফলের গাছে পূর্ণ করে দিতে পারে। উৎপাদিত ফল কে পেল আর কে খেল সেটা বড় নয়, বড় কথা হল দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধি তো হলো,দেশের মানুষের পুষ্টি গ্রহন বাড়ল। খুব সহজেই হতে পারে বাংলাদেশের সবচেয়ে কম খরচের পানীয় খাঁটি ফলের রস, আর কেনা জানে রসের প্রতি রসনার আসক্তি?
বাংলাদেশের কৃষকেরা যে পরিমাণ ফসল উৎপাদনের জন্য যে পরিমাণ কায়িক শ্রম ব্যয় করেন তা পৃথিবীর অন্য কোন দেশের কৃষক করেনা , বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থায় যন্ত্রের ব্যবহার সম্ভবত পৃথিবীতে সবচেয়ে কম বা তার কাছাকাছি। তাই নীতি গত ভাবে বাংলাদেশের কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের মূল্য অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশী হওয়া উচিতৎ, কারণ বর্তমানে খুব সামান্য বিনিয়োগেই কৃষি জমি চাষ থেকে শুরু করে ফসল কর্তন পর্যন্ত প্রায় সব কাজই যান্ত্রিক উপায়ে করা যায়। অথচ বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা মূলত কৃষকের কায়িক শ্রম নির্ভর যা খুব সহজেই যান্ত্রিক উপায়ে প্রতিস্থাপন যোগ্য এবং তাতে ফসল উৎপাদনের প্রকৃত খরচও হ্রাস পাবে বহুলাংশে, আবার কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে অব মুক্ত শ্রম শক্তির সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার সার্বিক ভাবে দেশজ উৎপাদন বাড়াবে ও মানুষের জীবন-মান এর উন্নয়ন ঘটাবে। রাষ্ট্র ব্যবস্থা কোন রকমে দরিদ্র কৃষকদের বাঁচিয়ে রেখেছে প্রায় বিনা পয়সায় কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখার জন্য। অথচ সার ও তেলে যদি কোন ভর্তুকি না দিয়েও সম পরিমাণ অর্থ কৃষি যন্ত্র-প্রযুক্তি-উপকরণ খাতে বরাদ্দ দেয়া হয় তাহলে অচিরেই বাংলায় কৃষি বিপ্লব ঘটতে বাধ্য। কারণ সরকার যদি প্রতিটি গ্রামে সমবায়ের বা অন্য কোন ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে একটি করে কলের লাঙ্গল দিতে চায় তবে তা বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা ও ক্ষমতায়ন খাতে যা বরাদ্দ থাকে তার এক তৃতীয়াংশেরও কম খরচেই সম্ভব। অথচ বৃহত্তর স্বার্থে কৃষি উৎপাদনে বিনিয়োগই সর্বাধিক লাভ জনক এবং কৃষিতে যত বেশী যন্ত্র ও প্রযুক্তির ব্যবহার হবে তা তত বেশী লাভ জনক হবে এবং কৃষিতে যন্ত্রায়নই কৃষি বিপ্লবের কামানের গোলা যা ছাড়া যুদ্ধ জয় অসম্ভব।
বর্তমানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্বকে নিয়ে এসেছে হাতের মুঠোয়, আর বাংলাদেশ ভৌগোলিক ভাবে খুবই ছোট্ট এবং প্রাকৃতিক ভাবে প্রায় সু সমতল বিরল একটি দেশ। প্রতিটি গ্রামকে উন্নয়নের একক (সমবায় বা অন্য কোন আদলে) ধরে একটি জীবন্ত নেটওয়ার্কের আওতায় আনা যায় সহজেই। কারণ লাখ খানেক এককের নেটওয়ার্ক নজরদারি করা সম্ভব সার্ব ক্ষণিক ও কেন্দ্রীয় ভাবে। এজন্য নতুন বা বিশাল ব্যয়বহুল কোন প্রযুক্তির প্রয়োজন নেই আদৌ। কেবল প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা ও উদ্যোগ।

You may like:

রাষ্ট্র-সমাজ-অর্থনীতি মানবতার আসল ভীতি!

আমাদের বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যাবস্থা যে সব তত্ত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত তার অধিকাংশই ইতোমধ্যে তাত্ত্বিক ভাবে অসার বা ক্ষতিকর বা অনুপযুক্ত প্রমাণিত হলেও তা ব্যবহারিক জীবনে বহাল তবিয়তে কেবলমাত্র আমাদের মনোদৈহিক অভ্যস্ততার কারণে। আমাদের সমাজ/রাষ্ট্র/অর্থনীতির তাত্ত্বিক কাঠামো বর্তমান সময়ের সাথে একেবারেই খাপছাড়া যা আমাদের ভৌত বিজ্ঞানের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করছে। পরিহাসের বিষয় এই তিন বিষয়ই নির্ধারন করে আমাদের যাপিত জীবন!
জ্ঞান বিজ্ঞানের বিকাশের সাথে সাথে তা মানব জীবনকে সহজ ও উন্নত করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিরন্তর বিকাশের প্রত্যক্ষ সুফল ভোগ করি নিত্য দিন, পদার্থ বিজ্ঞানের বিকাশ আমাদের আমাদের অধিকাংশ কায়িক শ্রমের দায়িত্ব নিয়েছে, ইলেকট্রনিকস এর বিকাশ আমাদের জীবন ধারার মৌলিক কাঠামো বদলে দিয়েছে, পরমাণু বিজ্ঞানের বিকাশ মানুষকে প্রায় অসীম শক্তি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দিয়েছে। সেই সাথে তদুর্ধ গতিতে বিকশিত হয়েছে আমাদের স্বজাতী ধ্বংসের অদম্য ইচ্ছা আর আত্মবিনাশী কৌশল।
পদার্থ বিজ্ঞান বা রসায়নের মত ভৌত বিজ্ঞান চর্চার সবচেয়ে বড় সুবিধা এর যে কোন তত্ত্বই বাস্তবে প্রয়োগের আগে গবেষণাগারে শতবার এর ফলাফল সম্পর্কে সুনিশ্চিত হওয়া যায়। অন্তত সূযোগ থাকে সজ্ঞানে কোন ক্ষতিকর বিজ্ঞান চর্চা না করার তারপরেও হরহামেশা তা হচ্ছে। কিন্তু সমাজ,রাষ্ট্র এবং অর্থনীতির মত বিজ্ঞান চর্চা বাস্তবে ব্যার্থ হলে তবেই তা পরীক্ষাগারে পরীক্ষণ যোগ্য! যদিও এই তিন বিজ্ঞান নিয়ন্ত্রণ করে সমস্ত ভৌত বিজ্ঞান।
বিজ্ঞানের মূল স্বীকার্য হল যে কোন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব পর্যবেক্ষক নিরপেক্ষ ভাবে প্রকৃতির একটা নির্দিষ্ট ঘটনার সুনিশ্চিত ভবিষ্যতবানী করবে। কিন্ত কোন বিমূর্ত পরিবর্তনশীল ধারণার ভবিষ্যত বানীর সঠিকতা বৈজ্ঞানিক ভাবে যাচাইয়ের কোন মূর্ত পদ্ধতি নাই। ফলে সমাজ/রাষ্ট্র/অর্থনীতির মত বিজ্ঞান চর্চার ফলাফল ভোগ করে তবেই জানতে হয় এর লাভ ক্ষতি! বিজ্ঞান এর অন্যান্য শাখার মত যে কোন পর্যবেক্ষক এর সঠিকতা যাচাই করতে পারে না, এর জন্য দরকার হয় 'বিশেষজ্ঞ' পর্যবেক্ষকের। আর কেবল মাত্র এর লাভ ক্ষতি জানার জন্য এর দায় শোধ করতে হয় প্রজন্মের পর প্রজন্মকে! আসল সত্য এই তিন বিজ্ঞান কখনো জনকল্যাণে চর্চিত হয়নি, চর্চিত হয়েছে শাসকদের প্রয়োজনে ও অনুকম্পায় এবং তাদের পোষ্য জ্ঞানগর্ধভদের দ্বারা ।
বিজ্ঞানের সীমাহীন উন্নতি আমাদের দিয়েছে অপরিমেয় ধ্বংস ও সৃষ্টির ক্ষমতা। আমাদের ধ্বংসের ক্ষমতা কার্যক্ষেত্রে যে পরিমানে বিকশিত ও প্রকাশিত হয়েছে সেই তুলনায় সৃষ্টির ক্ষমতা অব্যবহৃতই থেকেছে যদিও ভোগ বিলাসে এর কিছু প্রয়োগ হয়েছে বাণিজ্যিক কারণে। তত্ত্বগত ভাবে মানব জ্ঞান মানব জাতির যৌথ সম্পদ হলেও তার মালিকানা এখন কর্পোরেট বেনিয়াদের। তাই জ্ঞান কখনও মানব কল্যাণে ব্যবহার হয়নি, নানা বাদ-মতবাদ ও টাকা-ক্ষমতার তাঁবেদার করে রাখা হয়েছে নানা কৌশলে, ব্যবহৃত হয়েছে ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান-ক্ষমতার স্বার্থে। মানব জ্ঞান মানব কল্যাণে সঠিক ভাবে ব্যবহার করা গেলে মাত্র সাতশ কোটি মানুষের জন্য পৃথিবী নামক এই গ্রহটি আসলেই স্বর্গসম হত! পৃথিবীতে অভাব বা সমস্যা বলে কিচ্ছুই থাকতনা। মানুষ ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত ভাবে অভাব মেটানোর কৌশল বহু আগেই রপ্ত করলেও বর্তমান পৃথিবীর শোষন-শাসন কাঠামোর অদৃশ্য জিঞ্জিরে শৃংখলিত অধিকাংশ মানুষকে গরীব করে রেখে তাদের রক্ত ঘামে পুঁজিপতির গতর বাড়ে আর বাড়ে কিছু মানুষের বিত্ত বৈভব অপরদিকে দারিদ্র নামক অদৃশ্য ক্যানসার দিনে দিনে বাড়তে থাকে যার নীল বিষে জর্জরিত এই বিশ্বের অধিকাংশ বাসিন্দা আর বর্তমান বিশ্বের কৃত্রিম এই দারিদ্র পুঁজির সচেতন ও দীর্ঘ মেয়াদী কৌশলের ফসল। যদিও কিছু ভাড়াটে জ্ঞানীদের দিয়ে নানা বিভ্রান্তিকর তত্ত্ব, তথ্য ও উপাত্তের মাধ্যমে এবং ভুঁইফোঁড় মিডিয়ার কল্যাণে 'দিনে দিনে দারিদ্র কমছে' এমন ধারণা সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে যা এক ধরনের ধাপ্পাবাজি ছাড়া আর কিছুই না। প্রচলিত ধারণায় মাথা পিছু আগের চেয়ে ভোগ বৃদ্ধিকে দারিদ্র হ্রাসের প্রধান লক্ষণ বলে বিবেচিত হলেও মাথা পিছু উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়টা কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। যদি একজন মানুষের ন্যায্য প্রাপ্যতার তুলনায় সে কতটা পাচ্ছে তার ভিত্তিতে দারিদ্র পরিমাপ করা যেত তাহলে দেখা যাবে আমরা প্রতিদিন দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হচ্ছি, আর আমাদের ধন চুরি হয়ে চর্বি জমাচ্ছে অন্যের পেটে!

You may like:

এখানে বেঁচে থাকাটাই মহাকাব্য!

কোন রকমে বেঁচেবর্তে থাকার জন্য একটা চাকরি বা কাজ পাওয়া আজকাল শুধু সোনার হরিণই নয়, রীতিমত যেন ইউরেনিয়ামের হরিণ। চারিদিকে হাহাকার, শুধু নাই নাই আর নাই। লক্ষ মেধাবী তরুণ বেকার ঘুরে বেড়াচ্ছে কাজের অভাবে, নীরবে ঝরে যাচ্ছে হাজারো সম্ভাবনা। স্বাধীনতার প্রায় চার দশক পেরলেও উৎকৃষ্ট মানের চাকর তৈরির লক্ষ্যে ব্রিটিশ আমলে যে শিক্ষা ব্যবস্থার শুরু তার গতরে লাগেনি আজো কোন মৌলিক পরিবর্তনের ছোঁয়া। লুণ্ঠন আর নির্যাতনের হাতিয়ার থেকে এখনো আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা কল্যাণ মুখী হয়ে উঠতে পারেনি। আমাদের রাষ্ট্র বা শিক্ষা কোন ব্যবস্থাই আমাদের সম্ভাবনাগুলোকে বিকশিত হবার জন্যে সহায়ক নয়। প্রাকৃতিক, সামাজিক ও জ্ঞান সম্পদের উপর সম অধিকার মানব কুলের জন্মগত মানবাধিকার হলেও অল্প কিছু মানুষ বা শক্তি সব কিছু কুক্ষিগত করে রেখেছে নিজের করে, যেন আর কারো কোন অধিকার নেই। মানুষের রক্ষা কবচ না হয়ে রাষ্ট্র যেন রাক্ষসদের পক্ষ নিয়েছে! আর এজন্য আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে শিক্ষা ব্যবস্থাও সেভাবে সাজানো যাতে মানুষকে এই অদৃশ্য রাক্ষসরা অনায়াসেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা হয়তো ‘স্মার্ট চাকর’ তৈরি করতে পারে, কিন্তু এমন মানুষ তৈরি করতে পারেনা যারা শিক্ষা জীবন শেষ করে কাজের জন্য অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে বসে থাকেনা, চাকুরী না পেলেও তাদের শিক্ষা জীবন ব্যর্থ হয়ে যায়না। অথচ আজকের যে বেকার সন্তানটি পরিবার, সমাজ ও দেশের বোঝা, সামান্য সুযোগ পেলেই উল্টো সে নিজেই টানতে পারে পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্রের বোঝা।
অল্প কিছু সাহসী মানুষই এর বিরুদ্ধ স্রোতের মুখে মাথা তুলে দাড়াতে পেরেছে, দাঁড়াচ্ছে ও দাঁড়াবে। এই মানুষগুলোই আমাদের সভ্যতার প্রগতিকে নিত্য শক্তি যোগাচ্ছে সামনে এগিয়ে যাবার জন্য। এই শক্তি জোগানো মানুষগুলোই এন্টারপ্রেনর বা স্বউদ্যোক্তা। এরা চাকুরী বা কাজ খোঁজেন, কাজ তৈরি করে, নিজের জন্যে, অন্যের জন্যে আবার দেশের জন্যেও। বাদবাকিদের অধিকাংশই কোন রকমে বেঁচে থাকে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কৃপায় বা বোঝা হয়ে। এন্টারপ্রেনর জন্মায় না, জন্মে সৃষ্টি হয়, তার পারিপার্শ্বিক অবস্থাই তাকে তৈরি করে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং স্বল্প, মধ্য বা দীর্ঘ মেয়াদী রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন নীতি-কাঠামো এন্টারপ্রেনর সহায়ক হলে আমাদের বিশাল জনগোষ্ঠী অন্যের মুনাফা সৃষ্টির হাতিয়ার না হয়ে প্রকৃতপক্ষেই মানবসম্পদে পরিণত হবে । আমাদের স্বাভাবিক জীবনধারায় একটা বয়স পর্যন্ত কেউ জিজ্ঞাসা করেনা সে কি করে, কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে চারিদিকের জিজ্ঞাসা ও মাথায় দু: চিন্তা দুটোই বেড়ে যায়। একটা কিছু করতে হবে; কিছু একটা করা দরকার! এমন টানাপোড়ন এর সময় শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবার জীবনেই আসে। যারা সোনার চামচ হাতে-মুখে-পকেটে বা ব্যাংকে নিয়ে জন্মায় তাদের কথা আলাদা। নিকট অতীতেও আমাদের পুরব পুরুষদের পেশা নিয়ে চিন্তা করতে হয়নি; উত্তরাধিকার সূত্রে কৃষকের ছেলে কৃষক, কামারের ছেলে কামার তেমনিভাবে সুতার-মজুরদের ছেলেরাও পিতার হাল ধরত। কৈশোরে প্রকৃতির হাতে জীবন যুদ্ধের কৌশল রপ্ত করে কমে প্রবেশের জন্য এখন দরকার কেবল একজন কিশোরী বধূ, ব্যস হয়ে গেল ছেলে সংসারী! জিবনযুদ্ধের ময়দানে আরেকজন সৈনিক বাড়ল। প্রকৃতির মতই সরল জীবনের পর্যায়গুলো। কিন্তু হাল আমলে আমাদের সনাতনী পেশাগুলো আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয়, কেবলমাত্র প্রাকৃতিক সম্পদ নির্ভর জীবন ব্যবস্থা আমাদের লালন করতে দৃশ্যত অক্ষম হলে এবং অপরদিকে বাজার অর্থনীতির পরিকল্পিত ও ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনে শুরু হয় পেটের টানে ঘর ছাড়া, মানুষ নিজের এলাকা ছেড়ে দূর থেকে দূরতম স্থানে চালিয়েছে দুঃস্বাহসি অভিযান, নিজের জীবন দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে গেছে তাদের আহরিতই সম্পদ ও জ্ঞান যার ফলাফল আজকের এই সুন্দর পৃথিবী।
এই যে “এখনো কিছু করিনা” পর্যায় থেকে “এখন কিছু করি” এই পর্যায়ে রূপান্তরের পরিবেশ ও শর্তাবলী তৈরির দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু নির্মম সত্য হচ্ছে স্বাধীন ভাবে নিজস্ব সম্ভাবনা বিকাশের প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থসামাজিক পরি-কাঠামো কোনটাই বিদ্যমান না থাকায় আমরা শেষ পর্যন্ত যা কিছুই করিনা কেন তা প্রায় সম্পূর্ণটাই ‘চান্স’ বা সুযোগ নির্ভর। নিজের চাওয়া বা পরিকল্পনা মাফিক চাকরি বা কাজ খুব কম মানুষের কপালেই জোটে। আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতি-কাঠামো বা আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে ‘এখনো কিছু করিনা’ পর্যায় থেকে ‘এখন কিছু করি’ পর্যায়ে রূপান্তরের জন্য মাঝখানে ‘এখন কিছু করব’ এই পর্যায়ে সংযোগের কোন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নেই। ফলে কেউ কিছু করতে চাইলেও তার সুযোগ খুবই কম, আমাদের কর্মজীবনে প্রবেশের পথ নির্মম, বন্ধুর ও প্রকৃতি বা ‘চান্স’ নির্ভর। কিন্তু যারা যে কাজে দক্ষ বা যে কাজে যে আনন্দ পায় সেই কাজ যদি প্রচলিত আইনের সাথে সংঘাতপূর্ন না হয় তবে তা করার অধিকার আমাদের অন্যতম মৌলিক অধিকার-জীবনের প্রতি অধিকার, মর্যাদার সাথে বেচে থাকার অধিকার যা মহান সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদ দ্বারা সুরক্ষিত আছে (“প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানব সত্ত্বার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে”)। এজন্য প্রয়োজনীয় সকল শর্তাবলী নিশ্চিত করণ ও তদনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণে রাষ্ট্র দায় বদ্ধ।

You may like:

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও আমরা বোকা বান্দা!

আমেরিকার অর্থনীতি অহেতুক সমৃদ্ধ বর্তমান আর্থিক ব্যবস্থায় ডলার নির্ভরতার কারণে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, কর্পোরেট বিজনেস হাউজ এবং ব্যক্তি আমেরিকার বিভিন্ন ব্যাংকে প্রচুর ডলার রিজার্ভ রাখে; ফলে আমেরিকার সব ব্যাংকেই বিশেষ করে বড় বড় ব্যাংক গুলিতে ঋণ দেবার মত অঢেল অর্থ থাকে। ব্যাংক গুলি বিভিন্ন নামে ও কৌশলে জনগনের মধ্য অতি সহজে বিপুল পরিমান ঋণ বিতরণ করে, ফলে জনগনের হাতে খরচ/ভোগ করার জন্য প্রচুর অর্থ আসে। এর ফলে জনগনের গড় ভোগ বেড়ে যায় সকল ক্ষেত্রেই। আর হাতে অথের্র সমাগম থাকায় কমের্র ও সৃষ্টি হয় ব্যাপক। এভাবেই আমেরিকার জনগন অন্যের অর্থে (বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও জনগনের) ভোগ বিলাস করে আসছিল; মুলত মুদ্রা ব্যবস্থার কারণেই নিরবে এই ঘটনা ঘটে আসছিল।
ব্যাংক গুলির হাতে প্রচুর অর্থ থাকায় তারা প্রাইম ও সাব প্রাইম মার্কেটের মাধ্যমে ঋণ বিতরণের মচ্ছব চালায়। স্বাভাবিক ভাবেই জনগনের ক্রয় ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ায় তাদের প্রচুর আমদানীও করতে হয়। আবার এই আমদানী যেসব দেশ থেকে করা হয় ঐসব দেশের অর্থই আমেরিকার ব্যাংকগুলির মাধ্যমে জনগনের হাত হয়ে আমদানীতে ব্যবহৃত হয়। মানে যাদের অর্থ তাদের কাছ থেকেই কেনা আবার তাদের অর্থেই, অর্থাৎ অথের্র মালিক বা উৎপাদক একজন আর ভোক্তা আরেকজন (!)। বিশাল এক মিথ্যের ওপর দাড়িয়ে থাকা আমেরিকার অর্থনীতি। খুব সহজে ঋণ পাওয়া যাওয়ায় প্রাথমিক ভাবে কারোরই ঋণ খেলাপি হওয়ার কথা নয় কারণ প্রত্যেকেরই ঋণ প্রাপ্তির যোগ্যতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়, পুরাতন ঋণ পরিশোধ করে অধিক পরিমানে নতুন নতুন ঋণ গ্রহণ, কই এর তেলে কই ভাজা আর কি! (বাংলাদেশের মাইক্রোক্রেডিট !!)। ব্যাংক গুলোও বছর শেষে বিপুল মুনাফা করে, ব্যাংক কর্মীরা উচ্চ হারে বেতন-বোনাস পেতে থাকে; চারি দিকে বাহ্‌ ! বাহ্‌ !!
উৎপাদনের অর্থনীতিতে ঋণ জিনিসটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয়। এই প্রয়োজন থেকেই ব্যাংক নামক মধ্যসত্ত্বভোগী প্রতিষ্ঠানের জন্ম যাদের মূল ঘোষিত কাজ হচ্ছে বিনিয়োগকারী ও ঋণগ্রহীতাদের মাঝে সংযোগ ঘটিয়ে ঝুকি হ্রাসের বিনিময়ে উদ্ভুত মুনাফার একটা অংশ ভোগ করা। এই সরল সমীকরনে ব্যাংক এর জন্ম হলেো কালক্রমে ব্যাংক নিজেই তো বটেই মাঝখানে আরো কিছু প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয় ঐ ঋণকে কেন্দ্র করে আরো ব্যবসা ক্ষেত্রের জন্ম হয় যা নন ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসাবে পরিচিত। এদর আবার কিছু কিছুর নৈতিক বা আইনহত কোন ভিত্তিই নেই, যেমন হেজ ফান্ড।
ব্যাংক উদ্বৃত্ত তহবিল সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ঋণ হিসাবে বিতরন করে, বিনিময়ে নির্দিষ্ট পরিমান সূদ পায়, অপরদিকে তহবিলের মালিককে ঐসূদ হতে কিছু কম সূদ দেয়। এই সূদের হারের ব্যবধান হতেই ব্যাংক তার পরিচালন ব্যায় মিটিয়ে মুনাফা করে। কিন্তু ব্যাংক ঋণ প্রদানের পর ক্রমে তাকে নিভর্র করে কাল্পনিক হিসাব সর্বস্ব আর্থিক লেন-দেন ব্যবস্থা গড়ে উঠে যা রীতিমত জুয়া খেলা। যদিও পুঁজিবাদীরা এই জুয়া খেলাটিকে ফাইনান্স, বিনিয়োগ, ষ্টক ব্যবসা ইত্যাদি সুন্দর সুন্দর নামে অভিহিত করেন। একটা পরিসংখ্যান দিলে ব্যাপারটা আরো পরিষ্কার হবে; ২০০৬ সালে সমগ্র পৃথিবীর মোট অর্থনৈতিক উৎপাদন ছিল ৪৭ ট্রিলিয়ন মা:ডলার। অথচ বিশ্বের শেয়ার বাজারের মুলধনীকরণ হয়েছে ৫১ ট্রিলিয়ন মা:ডলার, আভ্যন্তরীন ও আন্তর্জাতিক বন্ডের মূল্য ছিল ৬৮ ট্রিলিয়ন মা:ডলার, অন্যান্য আর্থিক দলিলের মূল্য ছিল ৪৭৩ ট্রিলিয়ন মা:ডলার। ৪৭ ট্রিলিয়ন মা:ডলার এর বাস্তব এই উৎপাদনকে কেন্দ্র করে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যের নামে যে জুয়া খেলা হয়েছে তা প্রধানত আমেরিকায় বা আমেরিকান নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে। এই সমস্ত প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রনকারী কর্তৃপক্ষের খুব একটা নিয়ন্ত্রন ছিলনা বা এখনো নেই।
এই অন্যান্য আর্থিক দলিলগুলোর জন্ম হয় ব্যাংকগুলি ঘড়-বাড়ি বা মূল্যবান স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রেখে ঋণ দেবার পর সেই ঋণকে সিকিউরিটিতে পরিণত করে যার নাম Mortgage Based Securities (MBS). বিনিয়োগকারীদের নিকট এই সিকিউরিটি বিক্রয় করে ব্যাংকগুলি আবারও ঋণ বিতরণের তহবিল সংগ্রহ করে। অর্থনীতির নৈতিকতায় কোন উৎপাদন বা মূল্য সংযোজন ছাড়া মুনাফা সৃষ্টির কথা নয়, কিন্তু এই ক্ষেত্রে মুনাফা এবং অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আশায়। কিন্তু ঋণগ্রহীতার ক্রেডিট হিষ্ট্রী না জেনে বিনিয়োগকারী সেই MBS এর উপর যাতে আস্থা রাখতে পারে এই সমস্যা সমাধানে আবির্ভাব হলো আরেক মধ্যসত্ত্বভোগী-ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকারের-Special Investment Vehicle বা SIV| SIV কোন এক বা একাধিক ব্যাংকের SIV গুলোকে কিনে নিয়ে সেগুলোকে একত্রিত করে আবার ঋণের ঝুঁকি অনুসারে ৩ টি ভাগে ভাগ করে:
১) ইকুইটি Equity Bond)-উচ্চ ঝুকিপুর্ন
২) মেজানাইন বন্ড (Mezanine Bond)-মধ্যম ঝুকিপুর্ন
৩) ইনভেস্টমেন্ট গ্রেড বন্ড (Investment Grade Bond)-কম ঝুকিপূর্ন
এভাবে মর্টগেজগুলোকে বিভিন্ন স্তরে বিভিক্ত করে ঋণের ঝুঁকি কোন একটি ব্যাংকের কাছ থেকে একাধিক বিনিয়োগকারীর মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে যে বন্ডগুলো তৈরী করা হলো এগুলোকে সাধারণভাবে বলা হয় CDO বা কোল্যাটারাল ডেট অবলিগেশান। ভালো ক্রেডিট হিস্ট্রি সম্পন্ন ঋণগ্রহীতার মর্টগেজ ভিত্তিক বন্ড থেকে হয় ইনভেস্টমেন্ট গ্রেড বন্ড। দুর্বল ক্রেডিট হিস্ট্রি সম্পন্ন ঋণগ্রহীতার মর্টগেজ ভিত্তিক ( যে মর্টগেজকে বলা হয় সাবপ্রাইম মর্টগেজ) বন্ডকে বলা হয় ইকুইটি বন্ড। মেজানাইন বন্ডের অবস্থান মাঝামাঝি। ইনভেস্টমেন্ট গ্রেড বন্ডের ঝুঁকি কম বলে সহ্‌জেই তার ক্রেতাও মেলে কিন্তু ঝুকিবহুল ইকুইটি বা মেজানাইন বন্ড নিয়ে হয় আসল খেলা!
এই পর্যায় প্রথম ধাপের ঋণ প্রদানকারী ব্যাংকগুলোই বিভিন্ন ভাবে এই হেজ ফান্ড গঠন করে উচ্চ ঝুঁকির CDO গুলো নিয়ে বাণিজ্য করার জন্য। যেহেতু ঝুকি বেশী তাই CDO গুলিতে বিনিয়োগে লাভও বেশী ফলে হেজ ফান্ডে বিনিয়োগকারীরও অভাব হয়না, বিভিন্ন উৎস থেকেই সে ফান্ড পায়। যে বাড়িটির মর্টগেজের উপর ভিত্তি করে ইকুইটি বন্ডের যাত্রা শুরু সেই বাড়ির মূল্য আরও বাড়বে এই আশায় উচ্চঝুঁকির ইকুইটি বন্ডগুলোর দাম বাড়তে থাকে।
ব্যাংক যেমন তার ঝুঁকি SIV-গুলোর উপর দিয়ে দেয়, এসআইভি-গুলো যেমন তার ঝুঁকি হেজ ফান্ডের উপর দিয়ে দেয়, হেজ ফান্ডগুলোও তেমনি সেই ঝুঁকিপূর্ণ বন্ডগুলো কোন ব্যাংকের কাছে জমা রেখে ব্যাংক থেকে ধার করে এবং সেই অর্থ আবার বিনিয়োগ করে। ইকুইটি সিডিও-গুলোর মূল্য যত বেশী হবে হেজফান্ড তার বিনিময় ব্যাংক থেকে তত বেশী অর্থ পাবে। সিডিও-গুলোর আসল ভিত্তি যে বাড়িটি, এতগুলো ধাপ পেরিয়ে এসে সেই বাড়ির মূল্যের সাথে আর বাঁধা থাকেনা সিডিও-এর মূল্য। ব্যাংকগুলো ও হাউসিং মার্কেট চড়া থাকার কারণে এবং ভবিষ্যতে আরও চড়া হলে এগুলো বিক্রি করে প্রভূত মুনাফা লাভের প্রত্যাশায় নির্দ্বিধায় অতিমূল্যায়িত সাব-প্রাইম মর্টগেজ এর উপর ভিত্তি করে তৈরী করা সিডিও-গুলোর বিনিময়ে ঋণ দিতে থাকে। সেই টাকায় হেজ-ফান্ডগুলো এসআইভি-এর কাছ থেকে বেশী বেশী সিডিও নিতে থাকে, ১ম ধাপের ব্যাংকগুলোও মর্টগেজের কালি শুকানোর আগেই তার সমস্ত ঝুঁকি সহ মর্টগেজগুলোকে এসআইভি এর হাতে স্থানান্তরের সুযোগে আরো বেশী বেশী করে সাব-প্রাইম ঋণ দিতে থাকে। এ এক ভানুমতির খেল।
এভাবেই কাল্পনিক হিসাবের উপড় ভড় করে অধিক লাভের প্রত্যাশার বেলুন একেবারে আকাশে উঠতে থাকে। কিন্তু সাব-প্রাইম ঋণ উচ্চসুদের হওয়ার কারণে এবং অধিকাংশ নিম্ন আয়ের মানুষ এর গ্রহীতা হওয়ায়, একসময় দেখা যায় তারা আর ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছে না (ঠিক বাংলাদেশের মাইক্রোক্রেডিট গ্রহীতাদের মতই!)। স্বাভাবিক ভাবেই সাব-প্রাইম মর্টগেজের উপর ভিত্তি করে তৈরী করা সিকিউরিটিগুলোর বর্তমান মালিক (ব্যাংক বা কোন ব্যাক্তি বিনিয়োগকারী) যখন বাড়িটি বিক্রি করতে চাইলো তখন সবাই মিলে বাড়ি বিক্রিকরার হিড়িকের কারণে সে উপযুক্ত মূল্য পেলনা এমনকি তার হাতে থাকা সিকিউরিটিগুলো বিক্রি করতে গিয়েও সে ক্রেতা পেল না। কেননা কেউই তখন জানেনা এই সিকিউরিটিস এর ভিত্তি মূল্য আসলে কত। যখন সবকিছু ভালোয় ভালোয় চলছিল, তখন কেউ ভিত্তিমূল্যের যথার্থতা নিয় পে্রশ্ন তোলেনি। কিন্তু সাবপ্রাইম ঋণগ্রহীতার ডিফল্টার হওয়া এবং হাউসিং বাজার পরে যাওয়ার কারণে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার মূল্যের সিকিউরিটিগুলো আক্ষরিক অর্থেই টয়লেট পেপারে পরিণত হলো। কেননা এর আর কোন মূল্য নেই, ভবিষ্যতে উচ্চমূল্য পাওয়ার আশা না থাকায় কেউ আর এগুলো কিনতে চাইছে না।
আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শিথিল নিয়ন্ত্রণের ফলে এই ঘটনা ঘটেছে, আসলে এই শিথিল নিয়ন্ত্রন আমেরিকার অজ্ঞাতে নয় বরং জ্ঞাতসারে এবং পরিকল্পিত ভাবে। অবশ্য এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নের জন্য খুব বেশী প্রচেষ্টার দরকার হয়নি, বৈশ্যিক মুদ্রা ব্যবস্থার ফলে বরং তাদের ঘড়ের দুয়ারে এসে সুযোগ ধরা দিয়েছে। সেই সুযোগে তারা হয়ে গেছে আমানতের খেয়ানতকারী। আমেরিকা তার ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে অন্যান্য দেশের অথের্র নিরাপত্তার বদলে নিজ দেশের জনগনের ভোগ বিলাসের ব্যবস্থা করেছে, তাই রাষ্ট্র হিসাবে আমেরিকা তার জনগনের কাছে বাহবার দাবীদার তো বটেই!
বর্তমান এই নিয়মবদ্ধ আর্থিক অনাচারের ফলে পৃথিবীর উৎপাদন ভোগ করে যারা ন্যায্যত তারা তার প্রাপক নয়, কেবল মাত্র বৈশ্বিক লেন দেন ব্যাবস্থায় ডলার ব্যবহৃত হওয়ায় অনেকটা প্রাকৃতিক ভাবেই আমেরিকায় অর্থনৈতিক ফানুস গড়ে উঠেছে। এই সমস্যার ন্যায় সঙ্গত সমাধান আমেরিকার ব্যাংকে জমাকৃত বিভিন্ন দেশের ডলার রিজার্ভ ফিরিয়ে আনা, যদিও তা এই মহুর্তে সম্ভব নয়। তাই ইউরোর মত আরো বিভিন্ন আঞ্চলিক মুদ্রার প্রচলন করা দরকার তাতে অন্তত কিছুটা ন্যায্যতা নিশ্চিত হবে। যদিও তাতে আমেরিকার অর্থনীতিতে এক কেয়ামত হয়ে যাবে আর তা হওয়াও উচিত। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যদি আমেরিকার ব্যাংকগুলিতে অন্যান্য দেশের ন্যায় একই নিয়মে শ্রেনীকরন করা হয় তাহলে সম্ভবত সর্বোচ্চ শ্রেনীকৃত ঋণের দেশে হবে আমেরিকা।
যে সংকট আজ বিশ্বপুঁজিবাদকে ছাড়খার করে দিচ্ছে তার সূচনা ইউএসএ তে ২০০৭ এর গ্রীষ্মকালে আবাসন শিল্পের ফানুস ফাটতে শুরু করার মধ্যে দিয়ে হয়নি। বরং ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে একটার পর একটা মন্দা এসেছে যথা ১৯৬৭. ১৯৭৪, ১৯৮১, ২০০১ এর মন্দা। দশকের পর দশক ধরে একটা স্থায়ী এবং মহামারীর মত সংক্রমণে পরিণত হয়েছে, শোষিত মানুষের জীবনযাত্রার মানের ওপর নেমে এসেছে পাহাড় প্রমাণ আক্রমণ।
পুজিঁবাদে যা কিছই ঘটুক না কেন তার ফলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্থ হয় খেটে খাওয়া মানুষ। এবারের মন্দাক্রান্ত অর্থনীতিতেও তাই ঘটছে। ইতিমধ্যেই আমেরিকায় চাকরি হারিয়েছে ৬ লক্ষেরও বেশী শ্রমিক, গৃহহীন হয়েছে হাজার হাজার নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং সবশেষে এই যে প্রাইভেট লোকসানের জাতীয়করণ তার খেসারতও বহন করতে হবে সাধারণ জনগণকে অতিরিক্ত ট্যাক্স প্রদানের মাধ্যমে এভাবে বেসরকারী লোকসানের সরকারী দায় গ্রহন সম্পর্কে Financial Times এর কলামিস্ট Willem Buit বলেন, "বর্তমান বাস্তবতা কি এমন যে, লগ্নীপুঁজি নিয়ন্ত্রীত অর্থনীতিতে যখন সবকিছু ভাল চলে, তখন বেসরকারী প্রতিষ্ঠান গুলো বেসরকারী মুনাফা কামায় আর যখনই কোন সমস্যা হাজির হয় তখন সাময়িক ভাবে সেই সমস্যাগ্রস্থ বেসরকারী প্রতিষ্ঠানটিকে সাময়িক সরকারীকরণ করা হয়, যার ফলে সমস্ত লোকসানের দায়ভার বহন করে জনগণ? তাই যদি হয়, তবে এগুলোকে চিরস্থায়ীভাবেই জাতীয়করণ করা হচ্ছে না কেন? "
স্বভাব গুণে বা দোষে যাই হোক, পুঁজির স্বভাব হলো ছড়িয়ে পড়া, মুনাফা হয়ে আত্মস্ফীতি ঘটানো। পুজির আন্তর্জাতিক স্বভাব এর প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশ হল আইএমএফ ও বিশ্বব্যাঙ্ক এবং একটু দূর অর্থে জাতিসংঘ। পুঁজির সাধারণ স্বার্থ হলো - বাজার অন্তহীনভাবে বেড়ে চলতে হবে, তার জন্য অন্তহীনভাবে প্রয়োজনীয় শর্ত তৈরি করে চলতে হবে। বাজার নিরন্তর বাড়া মানে মুনাফায় আত্মস্ফীত পুঁজিকে পুনঃ পু্‌নঃ বিনিয়োগে বসার জায়গা করে দেওয়া। একাজে দেশ, রাষ্ট্র, কনষ্টিটিউশন, বাউন্ডারী ইত্যাদি সব বাঁধা হটিয়ে একাকার করে সামনে এগিয়ে বাজারকে, ভোক্তা সৃষ্টিতে নিরন্তর কাজ করে যেতে হবে। বাজার বাড়লে যে কোন ম্যানুফ্যাকচারিং ট্রেড, উৎপাদনে বাড়তে পারবে।
বর্তমান সাম্রজ্যবাদী অর্থনীতি উৎপাদন ও বিনিময়ের এক বিশ্বব্যবস্থা যার মাধ্যমে সারাবিশ্বের শ্রমিক শ্রেণীকে শোষণের মাধ্যমে উদ্বৃত্ত মূল্যের বৈশ্বিক উৎপাদন হয়। আর এই উদ্বৃত্ত মূল্য উৎপাদনের নিরিখে ফাইনন্সিয়ালাইজেশান একদিকে বিশ্বপুঁজিবাদের টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় এবং অন্যদিকে পরজীবি একটি প্রক্রিয়া। পরজীবি- কেননা এটি কোন উদ্বৃত্ত তৈরী করেনা বরং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন উদ্বৃত্তে ভাগ বসায়। উদ্বৃত্ত মুনাফার পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে কেন্দ্রীভবন এবং তার মাধ্যমে মুনাফা তৈরীর নতুন রাস্তা তৈরী করা ও দ্রুত পুঁজি লগ্নি করে মুনাফা তুলে নেয়া আর ঝুঁকি দেখলে আরও দ্রুত সেই লগ্নি পুঁজি প্রত্যাহার করে নেয়া। এর সাথে আরেকটি বিষয় যুক্ত লগ্নী পুঁজির স্বল্পমেয়াদী আগমন ও বহির্গমণের মাধ্যমে কোন একটি দেশের স্থানীয় পুঁজিকে বশবর্তী রাখা ও পুঁজির পূণর্বিন্যাস ও নিয়ন্ত্রণ করা। আর এই ধরণের আর্থিক শৃঙ্খলা তৃতীয় বিশ্বের সবগুলো দেশের উপরেই আরোপ করা হয় এবং হচ্ছে। আমেরিকা নিয়ন্ত্রিত বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফ যাতে মূল চালকের ভূমিকা পালন করে কার্যত আমেরিকান তথা পুজিবাদের স্বার্থ সংরক্ষন করে চলেছে।
বিশ্বব্যাঙ্ক ও আইএমএফ কে অনেকেই বলেন "আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠান", এটা একেবারেই ভুল একটা ধারণা এবং বড় ধরণের ভ্রান্তি। যার প্রমাণ হলো বিশ্বব্যাঙ্ক এর সুদের হার ১% এর নীচে বা বিনাসূদে, বেশীর ভাগ চুক্তিতে দেখা যায় তা ০.৭৫%। চুক্তিতে আবার, আসল পরিশোধের সময়ও থাকে বেশ লম্বা, কমপক্ষে ২০ থেকে ৩৫ বছর। "অর্থলগ্নী" বা অর্থ লাগানো বা টাকা খাটানো বলতে আমরা যা বুঝি টাকা খাটিয়ে মুনাফা কামানো বা সুদি ব্যবসা। কিন্তু মুনাফা কামানো বা সুদের ব্যবসা বিশ্বব্যাঙ্ক ও আইএমএফ এর ঘোষিত বা অঘোষিত লক্ষ্য কোনটাই নয়।
১% এরও কম সুদে ২০-৪০ বছর দীর্ঘ মেয়াদী কোন ঋণকে "ফিনান্স ক্যাপিটালের" বিনিয়োগের মূল ফোকাস হলো- এর শর্তাবলী। বিশ্বব্যাঙ্ক হলো সব রূপের পুঁজির আরাম করে বসার কুশন তৈরির প্রতিষ্ঠান। সব ধরণের পুঁজি যাতে আরাম করে বসে স্ব স্ব কারবার করতে পারে তার পরিবেশ, শর্ত তৈরি করাই এর কাজ। ঐদেশের আইন, কনষ্টিটিউশন, রাষ্ট্র, রাজনৈতিক ব্যবস্থা, স্বাথের্র হাত মুচড়ে ধরে, প্রয়োজনে এর বদল ঘটিয়ে গ্লোবাল পুঁজির জন্য সুবিধাজনক আদল দেয়া, শর্ত ও পরিবেশ তৈরি করাই বিশ্বব্যাঙ্কের কাজ। এই কাজটা করতে বড় ধরণের ঋণ / বিনিয়োগ লাগে, তা সে করে। সবচেয়ে কম সুদে (০.৭৫%) এবং দীর্ঘ মেয়াদী ২০-৪০ বছর এবং কঠিন ও বিরাট শর্ত দিয়ে। সবকিছু সংস্কার, বদল করার শর্ত। ঋণে শর্ত দেবার ক্ষমতা অর্জন মানে হাত মুচড়ে ধরার ক্ষমতা। এই বিরাট অঙ্কের ঋণ / বিনিয়োগের লক্ষ্য মুনাফা কামানো নয়, শর্ত দেবার ক্ষমতা অর্জন। বরং লগ্নিপুঁজিসহ সবধরণের পুঁজি যাতে কারবার করতে পারে তার আয়োজন করার ক্ষমতা অর্জন।
পাঁচটা প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে বিশ্বব্যাঙ্ক গ্রুপ গঠিত, যা সংক্ষেপে বিশ্বব্যাংক নামে পরিচিত। এই পাঁচটার মধ্যে যার তৎপরতা সবচেয়ে ব্যাপক, সবচেয়ে প্রাচীন এর নাম হলো IBRD (International Bank Reconstruction & Development)। অথবা The Bank । বিশ্বব্যাঙ্কের লোন বলতে আমরা যা বুঝে থাকি তা মূলত IBRD এর লোন। IBRD এর জন্ম সবার আগে, তখন বিশ্বব্যাঙ্ক বলতে এটাকেই বুঝা হত। বাকি চার সহযোগীর জন্ম পরে ধাপে ধাপে। একসাথে এখন তা বিশ্বব্যাঙ্ক গ্রুপ। এই IBRD এর গঠন প্রকৃতি শেয়ার হোল্ডারদের মালিকানাধীন জয়েন্ট ষ্টক কোম্পানীরই মতন। তবে তফাৎ হলো, এটা কোন বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক নয়।
"স্বল্প আয়ের দেশগুলোকে সহায়তা দেবার জন্য ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বব্যাংক" - এই কথাটা সত্যি না। মুলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ধ্বংস প্রায় ইউরোপের অবকাঠামো "পুণর্গঠন ও উন্নয়নের " লক্ষ্যে পাঁচটা প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে বিশ্বব্যাঙ্ক গ্রুপ গঠিত, যা সংক্ষেপে বিশ্বব্যাংক নামে পরিচিত। কিন্তু দ্রুত ইউরোপের বাজার সংকুচিত হয়ে এলে পুজির স্বার্থেই ১৯৬০ সালের পরে নতুন বাজার খুজতে অপেক্ষাকৃত অননুন্নত এশিয়া-আফ্রিকার দিকে নজর দেয়। যুদ্ধে ইউরোপের অবকাঠামো ধ্বংস হলেও ছিল তাদের দক্ষ জনশক্তি। ফলে ইউরোপে কাজ করা যত সহজ ছিল এশিয়া-আফ্রিকায় তত সহজ ছিলনা। এই সমস্যা নিরসনে বিশ্বব্যাংক তার ‘অবকাঠামো’ ধারণায় পরিবর্তন আনে। আগে অবকাঠামো ধারণায় উৎপাদনে সংশ্লিষ্ট শ্রমকে অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করা হত না, পুঁজির আত্মস্ফীতি ঘটানোর জন্য দরকারী নিয়ামক শক্তি বলেও বিবেচনা করা হত না। শ্রমের অবকাঠামো মানে উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয়- ১. বিভিন্ন মাত্রার শিক্ষা, দক্ষতার যে শ্রম দরকার, ২. প্রতিদিন কারখানা, কারবারের দরজায় সুস্থ সবল শ্রমিক এর নিরবিচ্ছিন্ন হাজিরা, ৩. বুড়া কর্মক্ষম হয়ে গেলে সমাজের বড় আপদ না হয়ে যায়, ৪. বাচ্চা পয়দা করে, পেলে পুষে বড় করে সামাজিকভাবে নতুন নিরন্তর শ্রম প্রবাহ ইত্যাদি - সবকিছু যেন নিশ্চিত পাওয়া যায় এমন "শ্রমের অবকাঠামো" ও তার জন্য একটা পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ। ফলে তখন থেকেই "অবকাঠামো" উন্নয়নের ধারণা বদলে গিয়ে ফিজিক্যাল কাঠামো ইট কাঠ পাথর এর সাথে যুক্ত হয় - মানব কাঠমোর উন্নয়ন। শ্রমের অবকাঠামো ও ফিজিক্যাল অবকাঠামো উভয়ে মিলে অবকাঠামো ও তার উন্নয়ন। তাই বিশ্বব্যাংকের বিবেচনায় মানুষ ইট কাঠ পাথরের মত প্রকৃত অর্থেই আমরা এক একজন "বেনিফিসিয়ারি" বা object বৈ আর কিছু নয়।
১৯৩০ দশকের মত মন্দা ঠেকাতে আইএমএফ এর জন্ম। আজকে বলা হচ্ছে ২০০৮ এর মন্দা ১৯৩০ সালের চেয়েও ভয়ঙ্কর। তাহলে আইএমএফ রাখার দরকার কী? gold standard ডলার, ডলারের হেফাজত আমেরিকার আর ডলারের সাথে অন্য মুদ্রার বিনিময় হার সি'র থাকবে এটা ধরে নিয়ে যে আইএমএফের জন্ম হয়েছিল ১৯৬৮ সালের শেষের দিকে আইএমএফের ভিত্তিমূলক সে ভাবনাগুলো বর্তমানে মৃত প্রায়, অকেজো। সংগঠন হিসাবে আইএমএফের অসি-ত্ত্ব, ন্যায্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। এক হিসাবে দেখা যায়, ১৯৬০ সাল থেকেই বিভিন্ন দেশকে দেয়া আমেরিকার মোট ঋণ (ডলারে হিসাব করে দেয়া) তার ঘরে মজুদ সোনার মূল্যের চেয়ে বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে; অথচ ঐ ডলারের সোনায় বদল করার যোগ্যতা থাকার কথা। আমেরিকা ডলার বদল করে সোনা দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এককথায়, আইএমএফ দাঁড়িয়ে থাকার ভিত্তিমূলক ভাবনাগুলো সব ধসে পড়ে।
বর্তমান আর্থিক ব্যবস্থায় প্রত্যেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঐ দেশের মুদ্রা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকে। আগে টাকা ছাপতে ও বাজারে ছাড়ার আগে সমপরিমাণ মুল্যের সোনা ব্যাঙ্কে নগদ মজুদ রেখে তারপর ঐ টাকা বা মুদ্রা বাজারে ছাড়া হত। কাজেই নোট প্রদানকারী বা প্রতিশ্রুতিদানকারী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যে এই মুদ্রা বা নোটের সমপরিমাণ সোনা তার কাছে মজুদ আছে। যে কেউ নোটের বিনিময়ে সোনা চাইলে সে তা দিতে বাধ্য থাকবে। এধরনের মুদ্রাকে বলা হয় gold standard মুদ্রা। যে মুদ্রা gold standard নয় সে মুদ্রা দাঁড়িয়ে আছে ফাঁকা রাষ্ট্রীয় বা কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের প্রতিশ্রুতির উপর। অর্থনৈতিক পরিভাষায় যাকে fiat money বলে। আজকের দিনে প্রায় সব মুদ্রাই fiat money বা স্রেফ রাষ্ট্রীয় ডিক্রি জারির ক্ষমতাগুণে সে মুদ্রা।
আমেরিকা তার রপ্তানী আয়ের ঘাটতি মিটিয়ে নিচ্ছে নিজের ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করে। আমদানির বিপরীতে ট্রেজারি বিল নামক কাগজ রপ্তানী করছে। এটাকেই পণ্য হিসেবে দাঁড় করিয়ে নিজের আমদানিকে সচল রাখছে। এটা যদি না হত তাহলে আমেরিকার সাথে বাণিজ্যে অংশ গ্রহণকারী দেশের পাওনা মিটাতে আইএমএফকে এগিয়ে আসতে হত। তাদেরকে ধার দিতে হত আর রপ্তানীমুখি খাত সৃষ্টি কারর জন্য পরামর্শ দিতে হতো, প্রকল্প বানাতে হতো! ডলারের সব দোষ জানা সত্ত্বেও আরও বড় ক্ষতির ভয়ে অগত্যা সবাই মেনে নিচ্ছে। হিতে-বিপরীত হতে পারে, কারণ সবাই গভীরভাবে ডলারের মাধ্যমে পরস্পর সম্পর্কিত হয়ে আছে। একেই বলে গ্যারাকল! এক কেচকিতে পড়া অবস্থা। ফলে এইসব সুবিধা ভোগ করে ডলার টিকে আছে; অন্য কথায় বলা যায় ক্ষতিগ্রস্থরাই আরও বড় ক্ষতির ভয়ে টিকিয়ে রাখছে।
আইএমএফের "রপ্তানিমুখী উৎপাদনের" নীতি আমাদেরকে পাটের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করেছে। পাট থেকে মুখ ফেরানোর পক্ষে আইএমএফের হাতে যে যুক্তি লেগে যায় তা হলো, আমাদের পাটকলগুলো লোকসানী, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি ফলে এর ব্যয়, দায় মিটাতে সরকারী রাজস্ব আয়ের উপর মারাত্মক চাপ পড়ছে; সরকার চালানোর খরচ বেড়ে যাচ্ছে। ফলে এগুলো বিক্রি করে দেবার সুপারিশ করা হয়। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, জুট স্পিনিং মিল যেগুলোর সবই প্রাইভেট কোম্পানী এগুলোকে সরকারী ভর্তুকি দেবার বন্দোবস্ত করা হয়। এই ভর্তুকির টাকা পাটখাত সংস্কার কর্মসূচির নামে সরকারকে ঋণ দেয়া হয়। সরকার সেই ঋণ নিয়ে প্রাইভেট কোম্পানীকে নগদ ভর্তুকি দেয়া হয়।
Foreign Investment Promotion & Protection Act বলে আইএমএফের সদস্যদেশের জন্য একটা আইনের ছাঁচ করা আছে। ঋণ গ্রহিতা দেশের ঋণ পাবার প্রাথমিক শর্ত এটা। ফলে মান্য করা বাধ্যতামূলক। দ্বিতীয়ত, শর্ত মেনে ঋণচুক্তি আইএমএফের সাথে করে নিয়ে চলে গেলে হবে না, একটা নির্দিষ্ট সময়ের ভিতর দেশের সংসদে এ আইন পাশ করতে হবে। বাংলাদেশ ১৯৮০ সালে Foreign Investment Promotion & Protection Act, ১৯৮০ নামে সংসদে এই আইন পাশ করেছে। আইএমএফের টেমপ্লেটেড এই আইনের কারণে বিনিয়োগ সম্পত্তি সংশ্লিষ্ট দেশকর্তৃক বায়োজাপ্ত হয়ে যাবার বিরুদ্ধে একধরণের রক্ষাকবচ।
Structural Adjustment Facility (SAF) (১৯৮৫) ও পরে নতুন ভার্সানে Enhanced Structural Adjustment Facility (ESAF) (১৯৮৬) - এগুলোর কোনটাই আমাদের সিদ্ধান্ত নয়। সারা দুনিয়াকে রপ্তানিমুখী করে আকার দিতে Structural Adjustment Facility (SAF) চলেছিল ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত। এরপর ১৯৯৯ সাল থেকে The Poverty Reduction and Growth Facility (PRGF) এর জায়গা নেয়, যার শেষ এবছরে। আগামি বছর থেকে নতুন প্রোগ্রাম Extended Credit Facility (ECF) নামে যা হাজির হবে। এর বিশেষত্ত্ব ডোনারদের কাছে অর্থ সংগ্রহের পদ্ধতিতে, তাছাড়া এটা নতুন বোতলে পুরান মালই । এতদিন দাতাদের কাছে থেকে তিন-চার বছরের কমিটমেন্ট/অর্থ সংগ্রহ করে PRGF জাতীয় Facilities চালানো হত। এবারে নতুন পদ্ধতিতে অর্থ সংগ্রহ করা হবে বাজার থেকে; মানে আন্তর্জাতিক বাজারে যারা লগ্নিপুঁজির বিনিয়োগের ব্যবসা করে। স্বভাবতই সুদের হার হবে অনেক বেশি, বাণিজ্যিক ব্যবসার লোনের মত। এই অর্থ ঋণ নিয়ে আইএমএফ আবার ০.৫% সুদে ঋণসুবিধা আকারে বিতরণ করবে - এতে যে লোকশান হবে; অর্থাৎ দুই সুদের হারের যে ফারাক এই সুদ দাতাদেশগুলো দিয়ে দেবে। এতে নিট যা ফারাক, তা হলো, আগে পুরা অর্থ ছিল সরাসরি দাতা রাষ্ট্রের কোষাগারের এখন সে অর্থ আসবে টাকার বাজার থেকে, প্রাইভেট লগ্নিবিনিয়োগকারী ব্যবসায়ীর কাছে থেকে আর কেবল এর সুদটা কেবল দাতাদেশের রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে।
পোষাকে কোটা ব্যবস্‌হা আমেরিকান জাতীয় অর্থনীতির পক্ষে একটা উৎপাদনে সুরক্ষা (protectionist) নীতি ও ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে আমাদের রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতা আমেরিকার হাতে তুলে দেবার ব্যবস্থা করে দিয়েছে আইএমএফ। আইএমএফ আমাদের বেলায় বলছে, আমাদের আমদানি নীতিতে কোন সুরক্ষা নীতি থাকতে পারবে না, অবাধ আমদানির সুযোগ রাখতে হবে। আবার Multi-Fibre Agreement এর মাধ্যমে আমেরিকার protectionist পদক্ষেপ আমাদের মাথা পেতে দিতে বাধ্য করা হচ্ছে।
এই সব বাস-বতার জন্যই আমাদের দেশে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ ইত্যাদি সংস্থা (বা তথাকথিত আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠানসমুহ) আমাদের রাজনৈতিক কর্মকান্ডে তথা রাষ্ট্রের সার্বভেৌমত্ব জলাঞ্জলী দিয়ে সংস্কারের নামে তাদের প্রেসক্রিপশন গিলতে বাধ্য করছে। আর বিশ্বপুজিঁ যখন যেভাবে চায় আমরা সেভাবেই তৈরী হতে বাধ্য হচ্ছি । বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ কখনোই গনমানুষের উন্নয়নের কথা বিবেচনা করেনা বরং দরিদ্র দেশের দরিদ্র মানুষদের দারিদ্রের সূযোগ নিয়ে তাদের অদৃশ্য জিঞ্জিরে বাধা আজন্ম দাসে পরিণত করার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে। এই প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের বিশেষ করে দক্ষিন এশিয়ার দেশগুলির উচিৎ একসাথে কিছু পদক্ষেপ নেয়া, যেমন:
 ‘Foreign Investment Promotion & Protection Act’ বাতিল/সংশোধন/প্রতিস্থাপন এর জন্য জনমত তৈরী ও সরকারকে চাপ প্রয়োগ।
 IFIs অর্থায়িত বা প্রেসক্রিপশনকৃত প্রকল্পসমূহের Social/citizen audit পূর্বক ক্ষতি (আর্থিক, সামাজিক, পরিবেশগত ও অন্যান্য) নিরুপণ এবং সে হিসাবে ক্ষতিপূরণ আদায়ের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।
 চলমান এবং প্রক্রিয়াধিন/প্রস্তাবিত সকল প্রস্তাব/প্রকল্পের শর্তাবলী জনসম্মুখে উন্মুক্ত করে দেয়া এবং জনগনের মতামত গ্রহণের কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা ও তাদের মতামত আমলে নেয়া।
 আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থে অভিন্ন আঞ্চলিক মুদ্রা ব্যবস্থা গড়ে তুলে ক্রমান্বয়ে ডলার নিভর্রতা থেকে সম্পূর্ন বেড়িয়ে আসা।


You may like:

জ্ঞান বৃক্ষ!

জ্ঞান বীজ 1) " খোকন যাবে শশুড় বাড়ী টোপর মাথায় দিয়ে।"
=> জ্ঞান বৃক্ষ - বিয়ের জন্য শৈশবই উত্তম সময়।"

জ্ঞান বীজ 2) "লেখা পড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে।"
=> জ্ঞান বৃক্ষ– জীবন মানে গাড়ী-ঘোড়ায় চরা আর লেখা পড়া না জানলে টিকিট চেকার ঠকাবে ।

ফলাফল: সময়ের তেলে 1) ও 2) নং জ্ঞান বৃক্ষের গাছ পাকা ফলের আচার যা ষড়রিপুর বয়ামে প্রজ্ঞা নামে বাজারজাত কৃত:- "মানবকূলের জন্ম নারী আর গাড়ীর জন্য, এই দুইটা যত বেশী ততই জীবন ধন্য!"

পাদটিকা: সেই শিশু কাল থেকেই জ্ঞান বুদ্ধি আমার যতটা কম ভয় ততটাই বেশী। আকাশের তারা গুনে শেষ করা গেলেও আমার ভয়ের উৎস গুনে শেষ করা যাবে না। আর সরস্বতির গোস্বার কারণে বিদ্যা তো আর হলই না। তার উপর ইদানিং আমাকে দিবা নিশি ভয় দেখিয়ে তটস্থ রাখে “পরাজয়ের ডর” নামে এক মাফিয়া।
অগত্যা ভয়ে ভয়ে আমার গুরুকে একদিন আরজি জানালাম, "গুরু তোমার দোয়ায় ধন্য আমি ভয় করি না অকাল মরণ, কিন্তু আমার পরাণ না থাকিলে কে সেবিবে তোমার চরণ?" গুরু ভূঁরু কুঁচকে বললেন, "ভণিতা ছেড়ে বল চাস কি, এর আগে চেয়ে কি পাসনি!" কাঁচুমাচু করে বললাম, " এই মন সুন্দর এক খান অস্ত্র পেতে চায়, সুন্দরেরা দেখতে ছোট ক্ষমতায় নয়।" গুরু তাচ্ছিল্যের সাথে বললেন, "অস্ত্রের ভয় আনে নাকো জয় আনে নিদারন হতাশা, শত্রু বধিতে লাগে না কামান লাগে ভালবাসা।" এবার আমি একটু বিরক্ত হয়ে বললাম, "গুরু তোমাকেও কি করেছে আছর বাঙ্গালী ভূতে, সুযোগ পেলেই মন চায় জ্ঞান আর উপদেশ দিতে!" গুরু এইবারে মাথা চুলকে বললেন, " ওরে অর্বাচীন জ্ঞান হীন চাস রণতুর্য, দিলাম কামান তবে একটা শর্ত প্রযোজ্য!" । মোবাইল কোম্পানির উপর ভয়াবহ রাগ হলেও কামানের আশায় দাঁতে দাঁত চেপে বললাম "একটা কেন ইচ্ছে হলে যত খুশি দেবে, আমি কি ডরাই তোমার শর্ত রাঘবে!" এরপর বীর বেশে কামানের কাছে ঘেঁষে খুঁজে পেলাম শর্ত, মোটেও ছোট নয় মোটা দাগে লেখা তায় করে বেশ গর্ত, "স্বর্গ মর্ত্য যেথা খুশি শত্রু নিধন কর, দূর্বলকে মারলে তুমি নিজেই মরতে পার।" 

শর্তাভীত না হয়ে কামানসহ গুরুর কাছে থেকে বিদায় নিলাম। এই প্রথম ভয় না পেয়ে বুক ফুলিয়ে শত্রু নিধনের ব্রত নিয়ে শত্রুর খোঁজে নামলাম। প্রথমেই মনে পরল আমার জানের দুশমন মানুষ নিধনের কথা, কিন্তু মানুষ তো পৃথিবীর সবচেয়ে ভীতু ও দূর্বল প্রাণী! তাহলে তো শর্ত মোতাবেক কামান দাগা যাবেনা! এবার মনে পরল বিশ্বের হিংস্র জীব জানোয়ার এর কথা, কিন্তু এদের বিনাশের জন্য 'মানুষ'ই যথেষ্ট অযথা কামানের দরকার কি? আচ্ছা মৌলবাদ, সন্ত্রাসবাদ, পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এইগুলোর একটাতে দাগালে কেমন হয়! কিন্তু এরা তো এমনিতেই বুড়া, আজ বাদে কাল এমনিতেই মরবে। তবে কি শত্রুর অভাবে আমার শত্রু নিধনের মহান ব্রত পন্ড হবে?

এইবার একটু চিন্তায় পড়ে গেলেও হঠাৎ মাথায় জিন্জিরা বুদ্ধি খেলে গেল! আবার গেলাম গুরুর কাছে, অনুযোগের সূরে বললাম, "ডিজিটাল যুগে তুমি মোরে দিয়েছ এনালগ কামান, শত্রু নিধন পরের কথা কেমনে রাখিব নিজের মান!" গুরু মূখে কিছু না বললেও হাত ইশারায় আমাকে ওয়ার্কশপ দেখিয়ে দেন, তার মুখভঙ্গি দেখে আমার বুঝতে বাঁকি রইলা না যে আমার আপগ্রেড এর আবেদন মঞ্জুর করা হয়েছে।কামানটি আপগ্রেড করে অটো পাইলট, অটো টারগেট লক সিস্টেম ইনস্টল করে ম্যানুয়াল কামানকে ড্রোন কামানে উন্নীত করে নিলাম যাতে কামান নিজেই আমার দুশমনদের লক্ষ্য করে আক্রমন করতে পারে আর একটা প্লাজমা ডিসপ্লেও লাগিয়ে নিলাম যাতে শত্রুর মরণ যন্ত্রণা সরাসরি উপভোগ এবং শত্রুর বিবরন টেক্সট আকারে দেখা যায়।

এইবার ফিরে এসেই মহা আনন্দে নাচতে নাচতে কামানটা বের করে মহাশত্রু নিধনের মহা প্রত্যয়ের ঘোরে কামানের অটোপাইলট অন করে “জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু” অপশন সিলেক্ট করে ফায়ার বাটনে হাত রেখে অপেক্ষারত টার্গেট অটো লক এর জন্য, এমন সময় ডিসপ্লেকে আয়না ভেবে চমকে উঠি কারণ সেখানে ভেসে আছে আমার মাথার নিখুঁত ত্রিমাত্রিক ছবি যার নিচে লাল রং এর বড় বড় হরফে লেখা "বিষাক্ত জ্ঞান"!


You may like:

রাষ্ট্র-সমাজ-অর্থনীতি মানবতার আসল ভীতি!

আমাদের বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যাবস্থা যে সব তত্ত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত তার অধিকাংশই ইতোমধ্যে তাত্ত্বিক ভাবে অসার বা ক্ষতিকর বা অনুপযুক্ত প্রমাণিত হলেও তা ব্যবহারিক জীবনে বহাল তবিয়তে কেবলমাত্র আমাদের মনোদৈহিক অভ্যস্ততার কারণে। আমাদের সমাজ/রাষ্ট্র/অর্থনীতির তাত্ত্বিক কাঠামো বর্তমান সময়ের সাথে একেবারেই খাপছাড়া যা আমাদের ভৌত বিজ্ঞানের সুবিধা থেকে বঞ্চিত করছে। পরিহাসের বিষয় এই তিন বিষয়ই নির্ধারন করে আমাদের যাপিত জীবন!
জ্ঞান বিজ্ঞানের বিকাশের সাথে সাথে তা মানব জীবনকে সহজ ও উন্নত করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের নিরন্তর বিকাশের প্রত্যক্ষ সুফল ভোগ করি নিত্য দিন, পদার্থ বিজ্ঞানের বিকাশ আমাদের আমাদের অধিকাংশ কায়িক শ্রমের দায়িত্ব নিয়েছে, ইলেকট্রনিকস এর বিকাশ আমাদের জীবন ধারার মৌলিক কাঠামো বদলে দিয়েছে, পরমাণু বিজ্ঞানের বিকাশ মানুষকে প্রায় অসীম শক্তি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দিয়েছে। সেই সাথে তদুর্ধ গতিতে বিকশিত হয়েছে আমাদের স্বজাতী ধ্বংসের অদম্য ইচ্ছা আর আত্মবিনাশী কৌশল।
পদার্থ বিজ্ঞান বা রসায়নের মত ভৌত বিজ্ঞান চর্চার সবচেয়ে বড় সুবিধা এর যে কোন তত্ত্বই বাস্তবে প্রয়োগের আগে গবেষণাগারে শতবার এর ফলাফল সম্পর্কে সুনিশ্চিত হওয়া যায়। অন্তত সূযোগ থাকে সজ্ঞানে কোন ক্ষতিকর বিজ্ঞান চর্চা না করার তারপরেও হরহামেশা তা হচ্ছে। কিন্তু সমাজ,রাষ্ট্র এবং অর্থনীতির মত বিজ্ঞান চর্চা বাস্তবে ব্যার্থ হলে তবেই তা পরীক্ষাগারে পরীক্ষণ যোগ্য! যদিও এই তিন বিজ্ঞান নিয়ন্ত্রণ করে সমস্ত ভৌত বিজ্ঞান।
বিজ্ঞানের মূল স্বীকার্য হল যে কোন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব পর্যবেক্ষক নিরপেক্ষ ভাবে প্রকৃতির একটা নির্দিষ্ট ঘটনার সুনিশ্চিত ভবিষ্যতবানী করবে। কিন্ত কোন বিমূর্ত পরিবর্তনশীল ধারণার ভবিষ্যত বানীর সঠিকতা বৈজ্ঞানিক ভাবে যাচাইয়ের কোন মূর্ত পদ্ধতি নাই। ফলে সমাজ/রাষ্ট্র/অর্থনীতির মত বিজ্ঞান চর্চার ফলাফল ভোগ করে তবেই জানতে হয় এর লাভ ক্ষতি! বিজ্ঞান এর অন্যান্য শাখার মত যে কোন পর্যবেক্ষক এর সঠিকতা যাচাই করতে পারে না, এর জন্য দরকার হয় 'বিশেষজ্ঞ' পর্যবেক্ষকের। আর কেবল মাত্র এর লাভ ক্ষতি জানার জন্য এর দায় শোধ করতে হয় প্রজন্মের পর প্রজন্মকে! আসল সত্য এই তিন বিজ্ঞান কখনো জনকল্যাণে চর্চিত হয়নি, চর্চিত হয়েছে শাসকদের প্রয়োজনে ও অনুকম্পায় এবং তাদের পোষ্য জ্ঞানগর্ধভদের দ্বারা ।
বিজ্ঞানের সীমাহীন উন্নতি আমাদের দিয়েছে অপরিমেয় ধ্বংস ও সৃষ্টির ক্ষমতা। আমাদের ধ্বংসের ক্ষমতা কার্যক্ষেত্রে যে পরিমানে বিকশিত ও প্রকাশিত হয়েছে সেই তুলনায় সৃষ্টির ক্ষমতা অব্যবহৃতই থেকেছে যদিও ভোগ বিলাসে এর কিছু প্রয়োগ হয়েছে বাণিজ্যিক কারণে। তত্ত্বগত ভাবে মানব জ্ঞান মানব জাতির যৌথ সম্পদ হলেও তার মালিকানা এখন কর্পোরেট বেনিয়াদের। তাই জ্ঞান কখনও মানব কল্যাণে ব্যবহার হয়নি, নানা বাদ-মতবাদ ও টাকা-ক্ষমতার তাঁবেদার করে রাখা হয়েছে নানা কৌশলে, ব্যবহৃত হয়েছে ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান-ক্ষমতার স্বার্থে। মানব জ্ঞান মানব কল্যাণে সঠিক ভাবে ব্যবহার করা গেলে মাত্র সাতশ কোটি মানুষের জন্য পৃথিবী নামক এই গ্রহটি আসলেই স্বর্গসম হত! পৃথিবীতে অভাব বা সমস্যা বলে কিচ্ছুই থাকতনা। মানুষ ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত ভাবে অভাব মেটানোর কৌশল বহু আগেই রপ্ত করলেও বর্তমান পৃথিবীর শোষন-শাসন কাঠামোর অদৃশ্য জিঞ্জিরে শৃংখলিত অধিকাংশ মানুষকে গরীব করে রেখে তাদের রক্ত ঘামে পুঁজিপতির গতর বাড়ে আর বাড়ে কিছু মানুষের বিত্ত বৈভব অপরদিকে দারিদ্র নামক অদৃশ্য ক্যানসার দিনে দিনে বাড়তে থাকে যার নীল বিষে জর্জরিত এই বিশ্বের অধিকাংশ বাসিন্দা আর বর্তমান বিশ্বের কৃত্রিম এই দারিদ্র পুঁজির সচেতন ও দীর্ঘ মেয়াদী কৌশলের ফসল। যদিও কিছু ভাড়াটে জ্ঞানীদের দিয়ে নানা বিভ্রান্তিকর তত্ত্ব, তথ্য ও উপাত্তের মাধ্যমে এবং ভুঁইফোঁড় মিডিয়ার কল্যাণে 'দিনে দিনে দারিদ্র কমছে' এমন ধারণা সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে যা এক ধরনের ধাপ্পাবাজি ছাড়া আর কিছুই না। প্রচলিত ধারণায় মাথা পিছু আগের চেয়ে ভোগ বৃদ্ধিকে দারিদ্র হ্রাসের প্রধান লক্ষণ বলে বিবেচিত হলেও মাথা পিছু উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়টা কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। যদি একজন মানুষের ন্যায্য প্রাপ্যতার তুলনায় সে কতটা পাচ্ছে তার ভিত্তিতে দারিদ্র পরিমাপ করা যেত তাহলে দেখা যাবে আমরা প্রতিদিন দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হচ্ছি, আর আমাদের ধন চুরি হয়ে চর্বি জমাচ্ছে অন্যের পেটে!

You may like: